Daripalla
< back to Latest News

Prothom alo

12 Feb 2026

ইশতেহার প্রকাশ

নারীদের কর্মঘণ্টা কমানো হবে : জামায়াতের আমির

কর্মজীবী নারীদের কর্মঘণ্টা কমানোর বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের একটি বক্তব্য ঘিরে ব্যাপক আলোচনা–সমালোচনা হয়। দলটির নির্বাচনী ইশতেহারে এ বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। তবে ইশতেহার প্রকাশ অনুষ্ঠানে আবার নারীদের কর্মঘণ্টা কমানোর বিষয়টি সামনে এনেছেন শফিকুর রহমান।

বুধবার সন্ধ্যায় রাজধানীর বনানীর একটি হোটেলে জামায়াতের ইশতেহার প্রকাশ করেন দলের আমির শফিকুর রহমান। সেখানে তিনি বলেন, নারীদের কর্মঘণ্টা নির্ধারণে জামায়াতের একটি পরিকল্পনা রয়েছে। পর্যায়ক্রমে সেটি বাস্তবায়ন করা হবে। এ ক্ষেত্রে জামায়াতের পরিকল্পনা হলো, একজন নারী শিল্পকারখানা বা প্রতিষ্ঠানে যত ঘণ্টা কাজ করবেন, তার টাকা মালিকপক্ষ দেবে। বাকিটা সরকারের দায়।

জামায়াতের ইশতেহারে বলা হয়েছে, গ্রামীণ নারীদের স্বাবলম্বী করতে ‘আমার আয়ের সংসার’ নামে একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হবে। এই প্রকল্পের লক্ষ্য হলো নারীদের কেবল ভাতা না দিয়ে প্রশিক্ষণ ও উপকরণের মাধ্যমে তাঁদের নিজস্ব আয় ও কর্মজীবন নিশ্চিত করা। এককালীন সরকারি সহায়তা দেওয়া, যাতে নারীরা সেলাই, হস্তশিল্প, ফ্রিল্যান্সিং, কৃষির মতো উৎপাদনশীল কাজের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হতে পারবেন। নারীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত কাজের পরিবেশ এবং ন্যায্য মজুরি নিশ্চিতের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে ইশতেহারে।

ইশতেহার প্রকাশের অনুষ্ঠানে বক্তব্যে সাতচল্লিশ, একাত্তর ও চব্বিশের গণ-আন্দোলন ও বিপ্লবের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান জামায়াত আমির। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর একটি পরিচ্ছন্ন ও নৈতিক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে তাঁরা সামনে এগোচ্ছেন। অতীতের রাজনৈতিক সংস্কৃতি পেছনে ফেলে মেধা, উদ্ভাবন ও আদর্শনির্ভর নেতৃত্বের মাধ্যমে দেশ পরিচালনার কথা বলেন তিনি।

সাড়ে ১৫ বছর তৎকালীন সব বিরোধী দল, এ দেশের সুশীল সমাজ, সাংবাদিক মহল, আলেম-ওলামা কেউ নিপীড়নের হাত থেকে রক্ষা পাননি উল্লেখ করে জামায়াতের আমির বলেন, ‘আমরা মজলুম ছিলাম। কিন্তু ৫ আগস্টের পর অনেকেই অতীতের স্মৃতি মনে হয় যেন আমরা ভুলে গেছি।’

এ সময়ের মধ্যে কেউ কেউ নিজেদের ভাগ্য গড়ার জন্য লেগে গেছেন এবং নানাভাবে দেশের মানুষকে কষ্ট দিচ্ছেন বলে মন্তব্য করেন শফিকুর রহমান। এই প্রেক্ষাপটে জামায়াতের ইশতেহার জনবান্ধব, ব্যবসাবান্ধব, শান্তিবান্ধব ও শৃঙ্খলাবান্ধব হবে বলে উল্লেখ করেন দলটির আমির।

জামায়াত বলেছে, এই ইশতেহার কেবল রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়, বরং একটি বৈষম্যহীন ও ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের রূপরেখা।

২৬ বিষয়ে অগ্রাধিকার

জামায়াতের ইশতেহারে ২৬ বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে, সেগুলো হলো ‘জাতীয় স্বার্থে আপসহীন বাংলাদেশ’ স্লোগানের আলোকে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থে আপসহীন রাষ্ট্র গঠন; বৈষম্যহীন, ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক একটি মানবিক বাংলাদেশ গঠন; যুবকদের ক্ষমতায়ন ও রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁদের প্রাধান্য দেওয়া; নারীদের জন্য নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্র গঠন; আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সার্বিক উন্নয়নের মাধ্যমে মাদক, চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসমুক্ত একটি নিরাপদ রাষ্ট্র বিনির্মাণ; প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক ও স্মার্ট সমাজ গঠন; প্রযুক্তি, ম্যানুফ্যাকচারিং, কৃষি, শিল্পসহ নানা সেক্টরে ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি; সরকারি চাকরিতে বিনা মূল্যে আবেদন, মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ ও সব ধরনের বৈষম্য দূরীকরণ; ব‍্যাংকসহ সার্বিক আর্থিক খাত সংস্কারের মাধ্যমে আস্থা ফিরিয়ে এনে বিনিয়োগ ও ব্যবসাবান্ধব টেকসই স্বচ্ছ অর্থনীতি বিনির্মাণ; সমানুপাতিক (পিআর) পদ্ধতির নির্বাচনসহ সুষ্ঠু নির্বাচনী পরিবেশ সৃষ্টি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা শক্তিশালী করে সুসংহত ও কার্যকর গণতন্ত্র নিশ্চিত করা; কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার ও কৃষকদের সহযোগিতা বাড়ানোর মাধ্যমে কৃষিতে বিপ্লব সৃষ্টি করা; ২০৩০ সালের মধ্যে সম্পূর্ণ ভেজালমুক্ত খাদ্যনিরাপত্তা এবং ‘তিন শূন্য ভিশন’ (পরিবেশগত অবক্ষয়ের শূন্যতা, বর্জ্যের শূন্যতা ও বন্যা-ঝুঁকির শূন্যতা) বাস্তবায়নের মাধ্যমে সবুজ ও পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ গড়া; ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশের পাশাপাশি শিল্প প্রতিষ্ঠা, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতের মাধ্যমে ব্যাপক ভিত্তিতে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান তৈরি; শ্রমিকদের মজুরি ও জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি এবং মানসম্মত কাজের পরিবেশ, বিশেষ করে নারীদের নিরাপদ কাজের পরিবেশ সৃষ্টি করা; প্রবাসীদের ভোটাধিকারসহ সব অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং দেশ গঠনে আনুপাতিক ও বাস্তবসম্মত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা; সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘু (মেজরিটি-মাইনরিটি) নয়, বরং বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে সবার নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং পিছিয়ে থাকা নাগরিক ও শ্রেণি-গোষ্ঠীর জন্য বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করা; আধুনিক ও সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা প্রদান এবং গরিব ও অসহায় জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যায়ক্রমে বিনা মূল্যে উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা; সমসাময়িক বিশ্বের চাহিদা সামনে রেখে শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার এবং পর্যায়ক্রমে বিনা মূল্যে শিক্ষা নিশ্চিত করা; দ্রব্যমূল্য ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রেখে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং অন্যান্য মৌলিক চাহিদার পূর্ণ সংস্থানের নিশ্চয়তা; যাতায়াতব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো এবং রাজধানীর সঙ্গে বিভাগীয় শহরগুলোর সড়ক বা রেলপথের দূরত্ব পর্যায়ক্রমে দু-তিন ঘণ্টায় নামিয়ে আনা।

দেশের আঞ্চলিক যোগাযোগ ও ঢাকার অভ্যন্তরীণ যাতায়াতব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন আনা; নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জনা স্বল্প মূল্যে আবাসন নিশ্চিত করা; ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পূর্ণ বিলোপে চলমান বিচার ও সংস্কার কার্যক্রমকে অব্যাহত রেখে বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পুনর্জন্ম রোধ করা; সর্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা চালু করার মাধ্যমে নিরাপদ কর্মজীবন ও পর্যায়ক্রমে সব নাগরিকের আন্তর্জাতিক মানের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা; সব পর্যায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির মাধ্যমে সুশাসন নিশ্চিত করে একটি সুখী ও সমৃদ্ধ কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং সব পর্যায়ে সৎ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গঠন।

ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পূর্ণ বিলোপসহ ২৬ বিষয়ে অগ্রাধিকার

জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘আজকে আমি একজন আহত সৈনিক। গত কয়েক দিন ধরে দেখেছেন, আমার ওপর চতুর্দিক থেকে মিসাইল (ক্ষেপণাস্ত্র) নিক্ষেপ করা হচ্ছে। আমি কোনো অ্যান্টি-মিসাইল ইউজ (ব্যবহার) করব না। বরং আপনাদের সাক্ষী রেখে, যাঁরা সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে আমার চরিত্র হনন করেছেন, আমি তাঁদের সবাইকে ক্ষমা করে দিই।’

আজ বুধবার সন্ধ্যায় রাজধানীর বনানীর একটি হোটেলে জামায়াতের ইশতেহার প্রকাশ অনুষ্ঠানে শফিকুর রহমান এ কথা বলেন।

জামায়াতের আমির বলেন, ‘আমার রক্ত এবং মেজাজের সাথে প্রতিশোধ মানায় না, যায় না। আমি প্রতিশোধের রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না। আমি বিশ্বাস করি, আমি যদি আমার কোনো সহকর্মীকে, বন্ধুকে, ভাইকে তাঁর ভুলের জন্য ক্ষমা করতে পারি, তাহলে আমিও সমাজের কাছে একদিন আমার ভুলের জন্য ক্ষমা আশা করতে পারি।’

শফিকুর রহমান বলেন, ‘কিন্তু সেই আমি মানুষটাই যদি প্রতিশোধের রাস্তা ধরে হাঁটতে চাই, তাহলে আমার ওপর থেকে আরেকজনের প্রতিশোধ নেওয়ার অধিকার তৈরি হয়ে যায়। এই প্রতিশোধ প্রতিহিংসার রাজনীতি কুরে কুরে আমাদের সমাজের, দেশের অনেক ক্ষতি করে ফেলেছে। ওই পেছনের রাজনীতি আর ধারণ করে চলতে চাই না।’

বক্তব্যে ’৪৭, ’৭১ ও ’২৪-এর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান জামায়াতের আমির। তিনি বলেন, ৫ আগস্টের পর একটি পরিচ্ছন্ন ও নৈতিক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে তাঁরা সামনে এগোচ্ছেন। অতীতের রাজনৈতিক সংস্কৃতি পেছনে ফেলে মেধা, উদ্ভাবন ও আদর্শনির্ভর নেতৃত্বের মাধ্যমে দেশ পরিচালনার কথাও তুলে ধরেন তিনি।

জামায়াতের ইশতেহার জনবান্ধব, ব্যবসাবান্ধব, শান্তিবান্ধব ও শৃঙ্খলাবান্ধব উল্লেখ করে শফিকুর রহমান বলেন, ‘ইশতেহারের প্রত্যেকটি পয়েন্ট দিন, সপ্তাহ, মাস এবং বছর গুনে ওই দলের কাছ থেকে আদায় করে নেওয়া, বুঝে নেওয়া জনগণের অধিকার। আমরা সেই অধিকারটাই তুলে দিতে আজকে এখানে দাঁড়িয়েছি।’

সবার প্রত্যাশিত দেশ গড়তে চান জানিয়ে জামায়াতের আমির বলেন, ‘দুঃখের বিষয়, গত সাড়ে ১৫ বছর তৎকালীন সব বিরোধী দল, এ দেশের সুশীল সমাজ, সাংবাদিক মহল, আলেম-ওলামা কেউ নিপীড়নের হাত থেকে রক্ষা পাননি। আমরা মজলুম ছিলাম। কিন্তু ৫ আগস্টের পর অনেকেই অতীতের স্মৃতি মনে হয় যেন আমরা ভুলে গেছি।’

শফিকুর রহমান আরও বলেন, ‘এ সময়ের ভেতরে কেউ কেউ নিজেদের ভাগ্য গড়ার জন্য লেগে গেছেন এবং নানাভাবে দেশের মানুষকে তাঁরা কষ্ট দিচ্ছেন যার সাক্ষী আপনারা সবাই, যার সাক্ষী ১৮ কোটি মানুষ। আমরা বড় বিনয়ের সাথে তাঁদের অনুরোধ করেছিলাম, আমরা ছিলাম মজলুম, আমরা যেন কোনো অবস্থাতেই জালিম না হই।’